আদি
অতনু চৌধুরী
পর্ব – ১
সোজা
রাস্তা টা ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই ডান হাতে একটা রাস্তা ভেঙ্গে যাচ্ছে। ওই রাস্তা
ধরে কয়েকপা এগিয়ে গেলেই
‘শান্তি কুটির’। নামেই কুটির
আসলে তা তিনতলা বিশিষ্ট এক রাজপ্রাসাদ। শান্তি
জ্বলজ্বল করছে বটে, তবে কোথাও শান্তির ছিটেফোঁটাও নেই। শান্তি কুটীরের
প্রসাদ রঞ্জন সেন একজন সরকারি গেজেটেড অফিসার। অন্যদিকে ওনার মহিষি ইরাবতী সেন একটি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত
উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে টিচার-ইন-চার্জ। সম্পদ, প্রতিপত্তির কোন অভাব নেই। আভিজাত্য, ঐশ্বর্য, বিলাস, বৈভব আর পাঁচটা জমিদারের বাংলো বাড়িকেও হার মানায়। শুধু যেটা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি সেটাই নেই। বিয়ের
দশ দশটা বছর অতিক্রান্ত হলেও সেন দম্পতি সন্তানের মুখ দেখতে পাননি। এই নিয়ে কত
ডাক্তার, বদ্দি, হাকিম, জ্যোতিষ, দেবতার দোর ঘুরেছেন তার ইয়ত্তা নেই। মানসিক
অশান্তি তাই আষ্টেপিষ্ঠে জড়িয়ে ছিল। মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমোতে যেতেন।
সারারাত এপাশ-ওপাশ করে হয়তো ভোরের দিকে একটু ঘুমাতেন। ঘুম থেকে উঠেই এই যন্ত্রণার নাগপাশ। স্কুলে
গেলেই যে কোন সাধারন ব্যাপার নিয়ে সহকর্মী, অভিভাবকদের সাথে অযথা দুর্ব্যবহার
করতেন। হয়তো সবকিছুতেই তার এই গার্হস্থ্য মানসিক অসুখ তাকে এটা করাতে বাধ্য হত। সহকর্মীরা সহমর্মী ছিলেন। তারা ব্যাপারটা সহানুভূতির চোখে
দেখতেন তাই আড়ালে আবডালে ব্যাপারগুলোকে হেসে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু অভিভাবকরা তা শুনবে কেন ? সেই নিয়ে গণ্ডগোল লেগেই থাকতো।
কিন্তু তারা কিছু করতে পারত
না। কেননা, স্কুলের পাশাপাশি তিনি শাসক
শ্রেণীর পতাকাতলে মহিলা সমিতির নেত্রী ছিলেন। সেই প্রভাব আর ক্ষমতার জোরে তিনি
ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। অন্যদিকে প্রসাদ বাবু সারাদিন অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন
এসব করতে করতেই একরকম ভুলেই থাকতেন
কিন্তু বাড়ি ফিরলেই মনে হত যেন শূন্য পুরীতে এসে পড়েছেন। হাসি নেই, গল্প নেই,
গান নেই, আনন্দ, উচ্ছ্বাস নেই। আছে শুধু দিনগত পাপক্ষয়। প্রসাদ বাবু নিজেকে খুব
ক্লান্ত অনুভব করেন। তিনি ভাবলেন এভাবে আর চলতে পারে না কিছু একটা করতে হবে।
অনেকদিন
বাদে ইরাদি স্কুলে তার সমস্ত স্টাফদের একটা গ্র্যান্ড ফিস্ট দিলেন। সবাই খুব খুশি
হলেন কিন্তু সেই সঙ্গে অবাক এবং কৌতূহলীও হলেন। অবশেষে সেই মহেন্দ্রক্ষন এলো,
ইরাদি নিজেই সেই সারপ্রাইজটা দিলেন। তিনি আজ কয়েকদিন হল একটা ফুটফুটে বাচ্ছা মেয়ে
দত্তক নিয়েছেন। স্বভাবতই ম্যাডামকে বেশ খুশি দেখাচ্ছে। সত্যি মাতৃত্বেই যে
নারীধর্মের স্বার্থকতা তা ইরাদেবীকে না দেখলে বোঝা যেতনা, তবে কোথা থেকে নিয়েছেন ?
কবে নিয়েছেন ? শিশুটির বাবা মা কে ? – এসব কথা জিজ্ঞেস করার সাহস তার সহকর্মীরা
দেখালেন না। শুধুমাত্র ওনার খুশিতেই ওনারাও খুশি। এবং সেই খুশিও তারা সমান ভাগে
ভাগ করে নিলেন।
ফুটফুটে
বাচ্ছা মেয়েটার নাম দিলেন প্রত্যাশা। ডাক নাম আদি। এই আদিই এখন সেন দম্পতির খাওয়া,
ঘুম, স্বপ্ন, হাসি, কান্না, প্রত্যাশা, ভালবাসা – সব। আদিকে ঘিরেই আবর্তিত হতে
লাগল তাদের সকাল, সন্ধে, রাত্রি। তাদের অনুপস্থিতিতে আদিকে দেখার জন্য সর্বক্ষণের
একটি বিশ্বস্ত লোক রাখলেন তারা, আদি তাকে বুড়িমা ডাকে। এই বুড়িমা আদিকে খাওয়ায়,
ঘুম পাড়ায়, আদির সাথে খেলা করে। আদির মা ফিরে এলেই বুড়িমার ছুটি। তখন আদির সমস্ত
দুষ্টুমি, বায়না – সব মায়ের কাছে। আদির ঐ কচিকচি মুখে ‘মা’ ডাক, ফুলের মতো নির্মল
হাসি ইরাবতীকে পাগল করে দেয়। ইরাবতী এখন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। স্কুলে, সমাজে, পাড়া
প্রতিবেশীর কাছে একজন আদর্শ মানুষ। ইরাবতীর এখন একটাই ধ্যান জ্ঞান আদিকে মনের মতো
উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। খুব ছোট থেকেই ইরাবতী আদিকে গান শেখান। ইরাবতী অবাক হয়ে যান
আদির অদ্ভুত মিষ্টি গলা শুনে। যে গানটা শেখান, সেটাই চট করে তুলে নেয়। তারপর
দিব্বি গেয়ে শুনিয়ে দেয়। গানের প্রতি তার ঝোঁক বা আগ্রহও খুব বেশি, তা বলে
লেখাপড়াতেও আদি পিছিয়ে ছিলনা। ক্লাসে প্রতিবছর ফাস্ট না হলে সেকেন্ড হোত। এ নিয়ে
ইরাবতীর গর্ব ছিল ভীষণ।
আদির বয়স
তখন এই দশ কি সাড়ে দশ। ক্লাস ফাইভ। আদি দেখল তার মা কেমন তার থেকে দূরে দূরে থাকে।
তাকে স্নান করায় না, খাওয়ায় না, ঘুম পাড়ায় না, গান শোনায় না, কাছে টেনে নিয়ে আদরও
করে না। সব ঐ বুড়িমা করে। অথচ তার মা স্কুলেও যায় না। খালি ঘরের মধ্যে শুয়ে থাকে
আর বাবার সাথে নিচুস্বরে কথা বলে। তবে বাবা কিন্তু তাকে সেরকমই দেখে, আদর করে,
পাশে নিয়ে গল্প করে, মাঝে মাঝে ঘুম পারিয়েও দেয়। আসলে বাবা তো খুব একটা সময় পায়
না। অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত্রি হয়ে যায়, তারপর কফি খেতে খেতে মায়ের সঙ্গে হাসি
– গল্প করতেই ব্যাস্ত থাকে। তারপর আদি একদিন দেখল বাবা তাআর অসুস্থ মাকে গাড়ি করে
নিয়ে চলে গেল। ‘ মা কোথায় গেল ?’ বুড়িমাকে জিজ্ঞেস করলে বলে তোরজন্য একটা ভাই আনতে
গেছে। আদি কিছুই বুঝতে পারে না, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তারপর কয়েকদিন বাদে
একদিন সত্যিসত্যিই তার মা একটা ভাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরল। মুখে একরাশ যুদ্ধজয়ের হাসি।
আদি দৌড়ে গেল ভাইকে দেখতে। কিন্তু তাকে কাছে ঘেঁষতেই দিল না। দূর থেকে সে দেখল
একটা ছোট পুতুল কেমন চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে।
দিন কাটতে
লাগলো। আদির পাতে মাছ, মাংস, স্নেহ – ভালবাসা কমতে লাগলো। দুধ, ঘি বন্ধ হোল। কোন
কিছুর বায়না করলেই ধমক খেতে লাগল, ভাইকে নিয়ে খেলতে গেলে মার খায়। আদি তার অপরাধ
বুঝতে পারে না, শুধুই উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বুড়িমা যেদিন থেকে জেনেছে মালকিন
সন্তান সম্ভবা হয়েছে সেদিন থেকেই বুঝেছে ‘ এবার মেয়েটার কপাল পুড়ল ’। তাইতো আদিকে
বেশি বেশি করে কোলে টেনে নেয়। তার দিকে যত্ন করার চেষ্টা করে। প্রাণোচ্ছল ফুটফুটে
মেয়েটা কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে যেতে লাগলো। সেই খলখল হাসি, বকবকানি, ছুটোছুটি নিমেষে
কে যেন কেড়ে নিল। ওধু খবার সময় হলে টেরিলে আসে, তখন বাবা মাকে দেখে, বিশেষ কিছু বলে
না, খাওয়া হলে উঠে চলে যায়। সবসময় নিজের ঘরেই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
প্রত্যাশা
মতোই উচ্চমাধ্যমিকে আদি আশানুরুপ ফল করলো। ওর বন্ধু সুপ্রকাশের থেকে মাত্র পাঁচ নম্বর
কম পেয়েছে আদি। ওদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল অসম্ভব রকমের, কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল আরও
বেশী। হয়ত ঐ বন্ধুত্ব থেকেই নদী আসতে আসতে পার্বত্য উপত্যকা, মালভূমি থেকে সমতলভূমিতে
আদি নেমে অসেছিল। জয়েন্ট এন্ট্রান্সও দুই বন্ধুই ভাল ফল করে ডাক্তারিতে চান্স পেল।
দুজনেই এন. আর. এস মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে এম বি বিএস করতে লাগল। আদি যত বড়
হতে লাগল তত তার মনের জোর এবং সেই সঙ্গে অভিমানও তীব্র হতে লাগল। মায়ের তাদের প্রতি
অবহেলা তাকে দিন দিন কেমন যেন অসহিষ্ণু করে তোলে। তাই আদি ঠিক করলো বাড়ি থেকে আর কলেজে
যাবে না। সে হোস্টেলে থাকবে। মা কিছুতেই রাজী ছিল না। কিন্তু বাবার সম্মতিতেই সে হস্টেলে
চলে এলো। আর শুরু হোল - আদির জীবনের এক নতুন অধ্যায়। তার একটাই স্বপ্ন, একটাই সাধনা-
তাকে এস্টাব্লিষ্টড হতে হবে। মাঝে ছুটির দিনগুলোতে সুপ্রকাশের সঙ্গে নন্দন, একাডেমি,
ভিক্টোরিয়া ঘুরতে বেরুতো। তাতে করে তার মনের বিষণ্ণতা, জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা দূরে
চলে যেত। সুপ্রকাশও তাকে বেশি বেশি করে সঙ্গ দিয়ে যেতে লাগল। আদি ইচ্ছা করেই বাড়িতে
কম যেত। মাসে একবার সারামাসের খরচ একেবারেই বাবার কাছ থেকে নিয়ে চলে আসত। ছুটিছাটা
থাকলেও বাড়িতে যেতনা। হস্টেলেই থাকতো। বাবা রাগারাগি করলে বলত ‘ পড়াশোনার খুব চাপ।
সামনেই সেমেস্টার আছে।' তবে হ্যাঁ, বাড়ি গেলেই অমূল্য মানে তার ভাই সারাক্ষণ তার কাছে
কাছে থাকতা। দিদি দিদি করে পাগল করে দিত। তাই দেখে আদির চোখে জল আসতো। একদিন যখন ভাই
ছোটছিল তখন মা তাকে
কাছে যেতে দিত না, আদর করতেও দিত না। আর আজ, সেই ভাই তার কত কাছে, কত আদরের, কত
ভালবাসার।
এম.বি.বি. এস পাশ করে
আদি নর্থবেঙ্গলে একটা সরকারি হসপিটালে চাকরি নিয়ে চলে গেল। ইচ্ছে আছে চাকরি করার
সঙ্গে সঙ্গে এম.ডি –টা করে ফেলবে। সুপ্রকাশ কিছু
চাকরি নিলোনা। সে বাড়িতে থেকেই এম - ডি করবে বলে স্থির করলো। এবং পরে আদিকেও ইনসিষ্ট
করেছিল। আদি শোনেনি। আদির বাবাও তাকে বাড়িতে থেকে এম ডি করতে বলেছিল। কিন্তু একগুয়ে,
জেদি আদি কারো কথা না শুনেই নর্থবেঙ্গল চলে গেল। এখন বাড়ি আসাটাও খুব অনিয়মিত
হয়ে গেল। নমাসে, ছ'মাসে একবার আসতো। বাবার কাছে নিজের খরচের জন্য আর হাত পাততো
না। বরং সে নিজেই বাবাকে মাস গেলেই টাকা ট্রান্সফার করে দিত। আদির এম.ডি পরীক্ষার
তখন আর দু'মাস বাকী। ইতিমধ্যে ভাইয়ের জন্মদিনে, বাবার পুনঃ পুনঃ অনুরোধে দুদিনের
জন্য বাড়ি এসেছিল আদি। আদি নিজে সুপ্রকাশকে
ইনভাইট করেছিল। ভাইসের জন্মদিনে আদি তার স্বভাববিরুদ্ধ হৈচৈ, আনন্দ করেছিল। তাতে
তার মায়ের মন এবং চোখ কোনটাই ভালভাবে নেয়নি। জন্মদিনের পাটি শেষ হলে, বন্ধু
বান্ধর, আত্মীয় স্বজন সবাইকে বিদায় দিয়ে আদি নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিল।
সারাদিন যা ধকল গেছে তাতে আদি খুব ক্লান্তি অনুভব করছিল, আর কান্তিবশত তার দুচোখের
পাতা এক হছিল না। এপাশ ওপাশ করেও কিছুতেই ঘুম আসছিল না। জল খাবার জন্য হাত
বাড়ালো। যা, আজ তো জলটাও আনা হয়নি। হাতে জলের জগটা নিয়ে আদি ডাইনিং- এর দিকে পা
বাড়ালো। হঠাৎ তার মনে হল মা - বাবার মধ্যে কোন জিনিস নিয়ে জোরে জোরে তর্ক -
বিতর্ক, চলছে। আদির শোনার প্রবৃত্তি হোল না। কিন্তু তার কথা উচ্চারিত হতেই সে দাঁড়িয়ে
পড়ল। বরং আরও একটু কাছা- কাছি আগিয়ে গেল।
-
তোমার মেয়ে দেখছি, খুব মডার্ন হয়ে উঠেছে। বন্ধুদের সাথে
হেমে হেসে গায়ে যেন ঢলে পড়ছে। আদিখ্যেতা দেখলে মরে যাই।
-
দ্যাখো ইরা ও তোমার, মানে আমাদের মেয়ে। এখন ও বড় হয়েছে।
ভালমন্দ বুঝতে শিখেছে। কাজেই ওর স্বাধীনতাতে তো আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারিনা।
-
থামো। মেয়ে !
তবু যদি না ঐ রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনতাম।
-
চুপ করো ইরাবতী। তুমি কি বলছো ? মনে রেখো আদি আজ বাড়িতে আছে।
তাছাড়া দেওমালেরও কান আছে। কেউ কোথায় শুনে ফেললে ……
আদি কি শুনলো ? সে তো নিজের কানকেই আজ বিশ্বাস করতে পারছে না।
সে তাহলে মায়ের সন্তান নয় ? সে তাহলে এই সেন বাড়ির কেউ নয় ? সে রাস্তার মেয়ে ? হায়
ঈশ্বর কেন আমাকে বাঁচিয়ে রাখলে ? এই শোনার জন্য ? আমি এখন কি করবো? কোথায় যাব ? সকলকে
কি বোঝাবো ? সুপ্রকাশকে তাহলে এতদিন ধরে ঠকিয়ে গেলাম ? ওকি আমাকে ক্ষমা করবে ? এইসব
ভাবতে ভাবতে টলতে টলতে আদি তার ঘরে ফিরে এসেছিল। লাইট অন করে সে তার জামা কাপড় গুছিয়ে
নিল। প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট, কাগজপত্র সব সঙ্গে নিল। না, আর এক মুহূর্তও এ বাড়িতে
সে থাকবে না। আজ বেশ বুঝতে পারছে, মা কেন ভাই হতেই তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে ? কেন তাকে
স্নেহ - ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে ? দয়া ? আমাকে দয়া করেছে ? কে চায় এই দয়া ? আমি
চাই না, কারো দয়া চাই না। আদির ইচ্ছে করছে সব কিছু ভেঙে গুড়িয়ে দিতে। ইচ্ছে করছে
এই কান দুটোকে ছিঁড়ে ফেলতে। ইচ্ছে করছে বুকের ভেতর বসে যে হার্টটা দপদপ করছে তাকে উপড়ে
ফেলতে। সাররাত আদির আর ঘুম হল না। লাইটটা অনবরত অফ আর অন করতে থাকে। একটা ডায়েরি নিয়ে
সাররাত তাতে তার মনের কথা লিখে চললো। এক সময় ভোরের দিকে টেবিলে মাথা রেখে সে একটু ঘুমিয়ে
পড়েছিল। হঠাৎ ভাইয়ের ডাকে তার ঘুম ভেঙে গেল। কালকে রাতের ঐ ঘটনা আর একজন শুনে
ফেলেছিল। তাই সকাল সকাল উঠই সে দিদিকে ডাক দিয়েছে।
ডাইনিং টেবিলে আদি স্নান সেরে একেবারে রেডি হয়ে এসে বসল।
বাবার মুখোমুখি। ভাই আর মা তার বাঁ দিকে। আজকে আর বিশেষ কিছুতে হাত না দিয়ে কফিটা
কাপে ঢেলে নিয়ে চুমুক দিল আদি। হঠাৎ প্রসাদবাবু আদির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন
–
-
কিরে আদি, তোর চোখদুটো দেখছি জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেছে।
কাল কি সারা রাত ঘুমোসনি না কি ?
সে জশ্নের জবার না দিয়ে আদি সরাসরি বাবাকে চোখে চোখ রেখে
জিজ্ঞেস করলো –
-
আমি কে বাবা ?
-
এ আবার কি প্রশ্ন আদি ? তুই আমাদের মেয়ে। বলো না, আদি
আমাদের মেয়ে নয় ?
-
না বাবা, আমি তোমাদের মেয়ে নই।
-
কি যাতা বকছিস আদি ? তুই যদি আমাদের মেয়ে না হোস, তাহলে
কার মেয়ে ?
-
সেইটেই তো জিজ্ঞেস করছি মা। আমি কে ? কে আমার বাবা ? কে
আমার মা ?
-
দ্যাখ আদি, এই সকালবেলায় এই সব প্রশ্ন না করে ব্রেকফাস্টটা
ভাল করে কর দেখি।
-
বাবা আমি জানি, তুমি কখনো মিথ্যে বলো না। তুমিই আমার
জীবনের আদর্শ। সেটাকেই আমি সারাজীবন পাথেয় করে রাখতে চাই। এখন সত্যিটা বলো। আমাকে
তোমরা কুড়িয়ে এনেছিলে, তাই তো ?
-
এসব কথা ঠিক নয়, আদি।
আদি বাবাকে কোনদিন কাঁদতে দেখেনি। আজ তাই তার মনে হল এটাই সত্য।
এটাই সত্যের প্রকাশ।
-
তাই যদি না হবে ? তাহলে কাঁদছো কেন ?
-
আসলে তোকে আমরা হসপিটাল থেকে নিয়ে এসেছিলাম। রাস্তা থেকে
নয়।
-
আমার বাবা কে ? মা কে ?
-
জানি না মা, তোকে জন্ম দিয়ে হসপিটলে ফেলে রেখে তোর মা চলে
গিয়েছিল। কিন্তু কেউ জানুক আর না জানুক, ইশ্বর জানেন, তুই আমাদের মেয়ে।
আদি ডাইনিংটেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল। ঘর থেকে লাগেজ ব্যাগটা
নিয়ে বেরিয়ে এলো। বাবা মাকে প্রণাম করে গেটের দিকে যেতেই বাবা বলে উঠল –
-
তুই আমাদের ওপর রাগ করে চলে যাচ্ছিস মা ?
আদি আর উত্তর না দিয়ে চোখের জল মুছে এগিয়ে যায়। পিছন
থেকে অমুল্য ছুটে আসে। ভাইকে বুকে জড়িয়ে আদি হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে। চোখের জল
মুছে ভাইকে বলে –
-
ভাই, ভাল হয়ে থাকবি। ভাল করে লেখাপড়া করবি। আর- আর মায়ের
– বাবার খেয়াল রাখবি।
আদি বেরিয়ে এলো রাস্তায়। তখনত সে শুনতে পাচ্ছে বাবা মাকে
বলছে –
-
হোল তো ? তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হলো তো ? মেয়েটাকে শেষ পর্যন্ত
তাড়িয়েই ছাড়লে।
আদি আর দাঁড়ালো না। বাড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে একটা
ট্যাক্সি ধরে সোজা হাওড়া স্টেশন।
আজ চার - পাঁচদিন হোল আদি চলে এসেছে। একটা দিনের জন্যও সে
বাড়িতে বাবাকে ফোন করেনি। এমনকি বাবা ফোন করলেও তা সে রিসিভ করেনি। প্রথম প্রথম
বাবা ফোন করলে রিং হয়ে হয়ে ফোনটা কেটে যেত। তারপর একদিন তার বাবা দেখলো তার
ফোনটা আর রিং হচ্ছে না। সুইচড অফ। কি করবেন, না করবেন, প্রসাদবাবু কিছু ভেবে পেলেন
না। দিন দিন তিনি যেন ভেঙে পড়তে লাগলেন। মেয়েটাকে, এভাবে তিনি কষ্ট দিতে চাননি।
তিনি ভেবেছিলেন, এ সত্য কোনদিনই হয়ত প্রকাশ হবে না, যদি না ঐ দিন রাত্রে ইরাবতী
………
এদিকে সুপ্রকাশও আদির ফোন না পেয়ে বড়ই উতলা হয়ে উঠল। বারবার
ফোন করলেও ধরেনা, তারপর একদিন সুইচড অফ। আর এখন তো সবকিছুর বাইরে। অগত্যা সুপ্রকাশ
বেরিয়ে পড়ল নর্থবেঙ্গলের উদ্দেশ্যে। আদির কোয়ার্টারের সামনে এসে দেখলো দরজায়
তালা লগানো। ভাবলো হসপিটালে আছে। হসপিটালে গিয়ে খোঁজ করতে জানালো আজ দিন পনের হল
ডাঃ প্রতাশ্যা সেন রেজিগনেশন দিয়ে কোথায় চলে গেছেন। কোথায় গেছেন তা তিনি কাউকে
বলে যাননি। সুপ্রকাশ আবার কোয়ার্টারে ফিরে এলো। তাকে এদিক ওদিক করতে দেখে এক বয়স্কা
মহিলা এগিয়ে এলো। সরাসরি মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো - আপনি প্রকাশ বাবু ?
দিদিমনিকে খুজছেন ? দিদিমনি কোথায় চলে গেছে। যাবার সময় এই দুটো আপনার নাম করে
আপনাকে দিতে বলে গেছেন। অন্য কারো হাতে যেন না দিই সে ব্যাপারে মানা করে গেছেন। এই
নিন বাবু আপনার জিনিস। সুপ্রকাশ দেখলো একটা ডায়েরি। তাতে তার নাম লেখা। অন্য একটা মুখবন্ধ
সাদা খাম। সুপ্রকাশ সঙ্গে সঙ্গে সাদা খামটা ছিঁড়ে ফেললো। দেখলো একটা চিঠি -
“ সুপ্রকাশ,
আমি চলে যাচ্ছি। কোথায় যচ্ছি ?
কেন যাচ্ছি ? এসব কিছুই জানি না। শুধু এটুকু জানি, আমাকে যেতেই হবে। তোমাকে না
জানিয়েই যাচ্ছি, এর জন্য আমাকে ক্ষমা কোরো। এতদিন না বুঝে, না জেনে তোমাকে ঠকিয়েছি।
তাই আজ যখন সত্যটা জানতে পারলাম, তখন আর তোমাকে ঠকাতে সাহস বা স্পর্ধা আমার কোনটাই
হোল না। সত্যটা তুমি হয়ত এতদিন নিশ্চয় জেনেছো। না জেনে থাকলে ডায়েরি পড়ে জেনে
নিও। পড়ার পর নিশ্চয় আমার উপর খুব ঘেন্না হবে। সেটা তো খুবই স্বাভাবিক। তাতে আমার
কোন দুঃখ নেই। যা পেয়েছি তাতেই পাথেয় করে সারাজীবন বেঁচে থাকবো। ভয় পেয়ো না, আমি
মরব না, সেদিন যখন জন্ম দিয়ে আমার মা পালিয়েছিল, সেদিন তো মরিনি। ার আজ মরার তো
কোন প্রশ্নই আসে না। ভাল থেকো। সামনের দিকে এগিয়ে যাও। তোমার সাফল্যই আমার একমাত্র
কামনা।
ইতি -
আদি ”
চিঠিটা পড়ে ধীরে ধীরে
ভাঁজ করে আবার খামের মধ্যে ভরলো সুপ্রকাশ। নিজের অজান্তেই তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে
আসে। চশমাটা খুলে চোখ দুটো একটু পরিস্কার করে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল। রাজপথ
চলে গিয়েছে দূরে, বহু দূরে। সেদিকে তাকিয়ে সুপ্রকাশের মনে হোল এই চলাটাই বুঝি
জীবনের গতি। আর থেমে থাকাটাই বুঝি মৃত্যু।