আদি
অতনু চৌধুরী
পর্ব –
OBITUARIES
Prasad Ranjan Sen
( 21st September, 1972
– 15th September, 2023 )
Prasad Ranjan Sen, 50 of ‘Shanti Kutir' at 58 B. B. Ganguly
Street, kol 73 passed away on 15th September, 2023 at his own resident ‘Shanti
Kutir' on a massive heart attack.
He is survived by his wife Irabati Sen, one daughter, Pratyasha
Sen and a Son, Amulya Sen. He will be greatly missed by his family and friends.
সেদিন রোগীর
খুব একটা চাপ ছিলো না। আদি এক রকম খালি হাতেই বসেছিল। একটু আগে ডিসপেনসারির ছেলেটি
কাগজের ঠোঙায় গরম গরম কচুরি দিয়ে গেছে। সকালের জল খাবার। হঠাৎ সেদিকে চোখ যেতেই কাগজের
ঐ ঠোঙায় একটা ছবির দিকে তার চোখ আটকে গেলো। ভালো করে দেখলো সে। হ্যাঁ, তারই বাবা। বাবা
আর নেই। নিজের অজান্তেই তার দুচোখ ছাপিয়ে জলের ধারা নেমে আসে। পৃথিবীতে তার আর নিজের
বলে কেউ রইলো না। এই একটি মানুষই ছিল তার জগত, তার আদর্শ, ভাবনা, চলার অঙ্গীকার। সেই
মানুষটাই আজ চলে গেলো। ভাই একটা খবর দিলো না ? খবর কি করেই বা দেবে ? কাউকেই তো আমি
আমার অবস্থান জানাইনি। না, আর দেরি করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গেই খান দুয়েক জামা কাপড়
নিয়ে আদি রওনা হয়ে গেল। কেউ কিছুই বুঝতে পারলো না।
আদি যখন ভাড়াটে
ট্যাক্সি থেকে ' শান্তি কুটির ‘ - এর গেটে নামলো তখনও রাত্রির আভাসটুকু লেগে আছে ।
অনেক কিছুই বদলে গেছে। সামনে মন্ত বড় গেট, গেটে দারোয়ান। সামনে পিছনে আকাশচুম্বি বহুতল।
আদি একটু ইতস্ততঃ করলো। না, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা শোভন দেখায় না। বাধ্য হয়েই সে দারোয়ানের
কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে তাকে তুললো। ঘুম জড়ানো গলায় সে জিজ্ঞেস করল - কাকে চাই ?
তার বাবার
নামটাই হঠাৎ মুখে চলে এসেছিল। তারপর নিজেকে সংযত করে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল- "
মানে, মানে অমূল্য, অমূল্য সেন আছেন ?
- ও ছোটো বাবু ? তিনি তো এখন ঘুমাচ্ছেন ম্যাডাম। আপনি কে
? কোথা থেকে আসছেন ? বাবু কে হয় ?
- দেখুন এতো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আগে গেটটা
খুলুন। আমি ভেতরে গিয়ে বসে সব প্রশ্নের উত্তর দেব। প্লিজ তার আগে আমাকে একটু বসতে দিন।
সারা রাত দাঁড়িয়ে এসেছি। ঘুম হয়নি। তাই একটু বিশ্রাম দরকার।
দারোয়ান গেট
ঝুলতেই আদি গেষ্ট রুমে ধপ করে সোফাতে বসে পড়ল। তীব্র ক্লান্তিতে তার মাথাটা এলিয়ে দিল।
কতক্ষণ যে এভাবে কেটেছে তার মনে নেই। হঠাৎ অমূল্য'র ডাকাডাকিতে ওর ঘুম ভেঙে গেলো। তাকিয়ে
দেখে এক তাগড়াই পুরুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে। অবিকল বাবার মতো।
- কি রে দিদি, অমন হাঁ করে কি দেখছিস ? কখন এসেছিস ? আমাকে
ডাকিসনি কেন ?
গত রাতের ক্লান্তির
রেশ থেকে আস্তে আস্তে সে ফিরে এলো বাস্তব জগতে। তারপর হাসতে হাসতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে
বলল -
- কেমন আছিস ভাই ? কততো বড় হয়ে গেছিস !
- তার আগে বল, আমাকে ডাকিসনি কেন ?
- তুই তখন ঘুমাচ্ছিলি। তাই তোর ঘুম ভাঙাতে চাইনি।
- মা কোথায় রে ? মা জানে আমি এসেছি ?
- মা ওপরে। ঠাকুর ঘরে। না, মাকে এখন কিছুই জানাইনি। ওঠ,
ওঠ, তোর ঘরে যা। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে গল্প
করা সাবে।
আদি তার ঘরে
ঢুকে অবাক হয়ে যে গেলো। সে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সুন্দর পরিপাটি করে
সাজানো তার ঘর। টেবিলে পড়ার বইপত্র বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। আর সুন্দর আবলুশ কাঠে বাঁধানো
ফ্রেমে বাবার একটা ছবি। বাবার ছবির দিকে চোখ পড়তেই হু-হু করে বন্যার মত জমাট বাঁধা
মান - অভিমানের স্রোত বেরিয়ে আসতে লাগলো। কিছুতেই যেন তার বাঁধ মানছে না। ব্যাগপত্র
মেঝেতে রেখে ধপ করে বাবার ছবির সামনে বসে পড়ল সে। টেবিলে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে
কাদতে লাগলো; যেন বহুদিনের অবরুদ্ধ নদী আবার তার পথ খুঁজে পেয়েছে।
- আদি, আদি তুই, এসেছিস্ ! সেই এলি মা, আর কটা দিন আগে এলে
মানুষটা তোকে দেখে শান্তিতে চোখ বুজতে পারতো। এত অভিমান তোর মা ? আমি না – হয় ---------
কিন্তু এ' মানুষটা সত্যিকারেরই তোর বাবা ছিল রে মা, কিন্তু তোর জন্য চিন্তায় চিন্তায়
জীবনটাই শেষ করে দিলোরে মা।
আদি টেবিল
ছেড়ে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
- আমাকে ক্ষমা করো মা। আমি অভিমানে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
যদি বুঝতে পারতাম বাবা --------------------- ( চোখের জল আর কিছুতেই বাধ মানছে না )।
- যাক, ওসব কথা এখন পরে হবে। বাইরের জামা কাপড় ছেড়ে ফ্রেশ
হয়ে নীচে আয়। ভাই তোর জন্য ছটফট করছে।
- ঠিক আছে মা। আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। ভাইকে আর একটু অপেক্ষা
করতে বলো।
দেখতে দেখতে
দু-দুটো দিন কোনদিক দিয়ে যে কেটে গেলো তা আদি টেরই পেলো না। মা - ভাইয়ের সঙ্গে গল্প
করতে করতে মনে হচ্ছিল যেন কথা আর ফুরোবে না। বাবার কথা এলেই মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে
যেতো। বুকটা ভার ভার ঠেকতো। ইতিমধ্যে ভাই, অমূল্য একদিন তাকে সুপ্রকাশদার কথা জানালো।
এন আর এসেই জেনারেল ফিজিসিয়ান পোষ্টে আছে। বেশ নাম করেছে। আদি ভাইকে আর কিছু বলেনি।
শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা পড়ার চেষ্টা করেছিল। তারপর এমন ভাব করেছিল সেন
সে তাকে চিনেই না।
- নেক্সট ?
- একি তুমি ? কখন এসেছো ? আমাকে জানাওনি কেন
?
- ডাক্তারবাবু সে কর্তব্য কর্মে ব্যস্ত আছেন।
তাঁকে কি বাধা দেওয়া চলে ?
- সেই হেঁয়ালি। কবে এসেছো বলো ? আমার চেম্বারের
ঠিকানা কোথায় পেলে ?
- ওসব কথা থাক্। তুমি আগে পেশেন্টস দেখা শেষ
করো, তারপর চুটিয়ে গল্প করবো।
- না. আমি আর পেশেন্ট দেখবো না। বয়, বয় -
বাইরে সবাইকে বলে দাও (আদি সুপ্রকাশের হাতটা চেপে ধরে)
- উহু, সেটা হবে না। তাহলে আমি চলে যাবো। মানুষগুলো
সব কত আশা প্রত্যাশা নিয়ে বসে আছে, আর উনি কিনা --------
- তাহলে তুমি একটু বসবে ?
- নিশ্চয়। তোমার কাছে বসে ডাক্তারি শিখবো।
দেখি তুমি কেমন পসার জমিয়েছো।
আদির জন্য আরও কত বড় বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল
তা সে জানতো না। সুপ্রকাশের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে যে সে আজও দার পরিগ্রহ করেনি।
বাবা - মা বলে বলে ফেড আপ হয়ে গেছেন, আর উনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন।
আদি কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারলো না যখন সে জানতে পারলো যে সুপ্রকাশ আজও তার পথ
চেয়ে বসে আছে।
- দ্যাখো সুপ্রকাশ, এসব পাগলামি ছাড়ো। অনেক
হয়েছে। এবার দেখে শুনে একটা সুন্দরী মেয়ে ঘরে আনো। যে তোমার উপযুক্ত হবে, মনের মতো
হবে, বংশ মর্যাদার সমকক্ষ হবে।
- সে তো কাবেই দেখা ও শোনা - সবটাই হয়ে গেছে।
শুধু ওপক্ষ রাজি হলেই চারহাত এক করে ফেলতে পারি।
- তোমার দেখা হয়ে গেছে ? রাজি হচ্ছে না ? কেন
? আমাকে তার অ্যাড্রেস দাও। আমি তাকে রাজি করাবো।
- তার অ্যাড্রেস নিয়ে কি করবে আদি ? সে তো আমার সামনে বসে
আছে। রাজি থাকলে আজই ------------
- ( আদি সুপ্রকাশকে থামিয়ে দেয় ) না, সুপ্রকাশ, তা আর হয়না।
আমার এ অবাঞ্চিত জীবনের সঙ্গে তোমাকে জড়াতে পারবো না। সত্যি বলছি সুপ্রকাশ, আমার এই
অনুরোধটা রাখো। নাহলে আমি কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবোনা। একেই তো বাবাকে হারিয়ে
মস্ত বড় ভুল করে বসেছি। আবারও যদি -------------- না, না, তা হয় না সুপ্রকাশ। তুমি
আমাকে মুক্তি দাও।
- দিতে পারি একটা শর্তে।
- কি শর্ত ? বলো, বলো - আমি যে কোন শর্তে রাজি আছি
- যদি তুমি আগে বিয়ে করো, তবেই আমি ------------
- হায় রে পাগল! আমার জীবনে
ও পর্ব কবেই চুকে গেছে। একবার এসো না আমার ওখানে, নিজের চোখেই সব দেখতে পাবে।
- সত্যি বলছো ? রহস্য করছো না তো ?
- রহস্য করবো কেন ? সে আমাকে কত ভালোবাসে। তারা আমাকে মাথায়
করে রেখেছে। ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়, সম্মানে বুকে ধরে রেখেছে।
- কি হেঁয়ালি করছো ? ( সুপ্রকাশকে দ্রুত অধীর দেখায় )
- সত্যি বলছি, ওখানকার নিরীহ, দরিদ্র, অসহায় মানুষগুলোই
আমার প্রাণ, আমার সংসার, আমার পথ চলার, বেঁচে থাকার প্রেরণা। কোন কিছুর বিনিময়েই আমি
তাদের বঞ্চিত করতে পারবো না।
- ও, এই ব্যাপার। তোমাকে কেই বা মাথার দিব্যি দিয়েছে তাদের
বঞ্চনা করার জন্য ? চলো, আমিও তোমার সঙ্গে ওদের একজন হয়ে যাই। একসাথে ওদের ভালোবাসা
ভাগাভাগি করে নেবো।
- না, সুপ্রকাশ। আমাকে আর অপরাধী করো না। এমনিতেই বাবাকে
হারিয়েছি। তাঁর যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট আমাকে আজীবন বিদ্ধ করবে। তার উপর তোমার বাবা -
মায়ের অভিশাপ আমি কুড়োতে পারবো না। তারচেয়ে এই ভালো - তুমি যেমন আছো, তেমনই থাকো,
আর - আর আমাকেও আমার মতো থাকতে দাও।
সুপ্রকাশকে আর বলার সুযোগ না দিয়ে আদি রেস্টুরেন্ট থেকে
ছুটে বেরিয়ে এসেছিল। তারপর ট্যাক্সি ধরে সোজা বাড়ি। জামা কাপড় গুছিয়ে রাতের ট্রেনের
জন্য প্রস্তুতি। মায়ের কান্না, হাহাকার, ভাইয়ের কাকুতি - মিনতি কিছুই তাকে টলাতে পারেনি।
সে বেশ বুঝেছিল এখানে থাকলে সে দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে। চারিদিক থেকে অক্টোপাশের মতো
বাধা তাকে জড়িয়ে ধরবে। না - না, কিছুতেই তার পথ, তার আদর্শ থেকে সে ভ্রষ্ট হতে পারবে
না। এই মানুষগুলো তো বটেই, সেই সঙ্গে সেই অগণিত পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী
মানুষগুলোকে সে কিছুতেই বঞ্চনা করতে পারবে না। মা - ভাইকে কথা দিয়ে এসেছিল, সময়, সুযোগ
পেলে সে আসা - যাওয়া করবে। কিন্তু এখানে থাকতে পারবেনা। শুধু বাবার ছবিটা বহুযত্ন করে
বুকে ধরে সে চলে এসেছিল তার গন্তব্যস্তলে।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরও কয়েকটা বছর। ইতিমধ্যে দু -
একবার আদি কোলকাতা থেকে ঘুরে ও এসেছে। না, সুপ্রকাশের সঙ্গে দেখা করেনি। নানা পারিপার্শ্বিক
চাপ, কাজের ব্যস্ততায় একরকম তার দিনগুলো বেশ কেটে যাচ্ছিলো। হঠাৎ সেদিন সকাল বেলায়
এক গাড়ি এসে দাঁড়ালো তার বাড়ির সামনে। জানলা দিয়ে মুখ বারিয়ে দেখে সুপ্রকাশ নামছে।
সঙ্গে বেশ মোটা ধরণের লাগেজ। ধড়াস করে উঠে বসে আদি। চোখে - মুখে জল দিয়ে রাত্রিবাস
ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে। একেবারে সুপ্রকাশের মুখোমুখি
- তুমি ? তুমি যে আসবে, সে তো জানাওনি ? তাছাড়া আমার এ্যাড্রেসই
বা পেলে কোথায় ?
সুপ্রকাশ কোন
কথা না বলে ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। লাগেজ নিয়ে আদির ঘরে প্রবেশ করে।
আদি হতভম্বের মত তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে থাকে। সূর্য তখন
রাঙ্গামাটির দেশে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে চারিধার। আদির গালদুটোও নরম রোদ্দুরে রাঙ্গা হয়ে
উঠে। দূরে একটা শালিক তার প্রিয়তমকে মিষ্টি মধুর সুরে গান শোনাচ্ছে।